তুই থাকবি আমার গল্পের পাতায়
(অসম প্রেম আর জীবনের হেরে যাওয়া চিরকষ্ট)
চাঁদেরহাট গ্রামের কলেজটা বড় কিছু না—একতলা বিল্ডিং, পেছনে বাঁশঝাড়, সামনে বিশাল মাঠ।
শীতের সকালে কলেজ শুরু হয় প্রার্থনার ঘন্টায়, আর বিকেলে সব ছেলেমেয়ের পিছু পিছু হাঁটার রাস্তায় ধুলো উড়ে।
রিফাত এই বছর ক্লাস ইলেভেনে ভর্তি হয়েছে।
দারিদ্র্য তার গায়ে লেখা—পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল, ফাটা ব্যাগ, আর চোখে গভীর কিছু একটা হবার তৃষ্ণা।
কিন্তু সব বদলে গেল যেদিন সে প্রথম রুপসাকে দেখল।
রুপসা — এক অপার্থিব নাম
রুপসা ছিল এমন মেয়ে—যাকে দেখে গ্রামের লোক বলত, “এ মেয়ে ছবির মতো!”
চুলগুলো এলোমেলো করে ঝুলে থাকত গালে, চোখ দুটো যেন জলতরঙ্গ,
আর যখন সে কলেজে ঢুকত, চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে যেত।
রিফাত তার দিকে তাকাতে ভয় পেত।
কিন্তু তাও সে প্রতিদিন কলেজে আসত শুধু তাকে একবার দেখার আশায়।
একদিন লাইব্রেরির বারান্দায় হঠাৎ রুপসার খাতাগুলো পড়ে যায়।
রিফাত ছুটে গিয়ে কুড়িয়ে রূপসার হাতে এগিয়ে দেয়।
রুপসা হেসে বলে, “তুই কি এখানে নতুন ভর্তি হয়েছিস?”
রিফাত মাথা নিচু করে বলে, “হুম…”
সেই হেসে বলা কথাটাই ছিল তাদের প্রথম চিহ্ন,আর প্রথম কথা বলা ।
আর রিফাতের হৃদয় তখন থেকেই রুপসার নামে লোহার ছিকল দিয়ে বাঁধা পড়ল।
ভালোবাসার সাহস
দিন যায়, সপ্তাহ যায়।
রিফাত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।
একদিন কলেজ শেষে বাঁশঝাড়ের পাশে রিফাত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল রূপসার জন্য । আজ তার মনে ভিতরের না বলা কোথা সব বলেই দিবে । অতপর বুকের সব সাহস নিয়ে বলেই ফেলে।
“রুপসা, আমি তোকে ভালোবাসি।”
রুপসা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
হাসে না, রাগেও না।
শুধু বলে, “তুই জানিস না তোর অবস্থান কোথায়।”
রিফাত মাথা নিচু করে চলে যায়।
কিন্তু কদিন পর…
রুপসা নিজেই পাশে এসে বসে।
বলল, “সবাই তো আমার সৌন্দর্য দেখে ভয় পায়, তুই অন্তত বলার সাহস তো রাখিস…”
ওদের সম্পর্ক শুরু হয়—লুকিয়ে দেখা, মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ ফাঁকি দেওয়া, আর কিছু না বলা অনুভব।
🕊️ সময় বদলায়, সমাজ এগিয়ে আসে
একদিন রুপসা বলে—
“আমার জন্য পাত্রপক্ষ আসছে রিফাত। শহর থেকে, বড় পরিবার।”
রিফাত থমকে যায়।
“তুই যদি এখন কিছু করতে না পারিস, আমরা একসাথে থাকতে পারব না…”
রিফাত চেষ্টা করে।
প্রচুর পড়াশোনা করে, কোচিংয়ে ভর্তি হতে চায়।
কিন্তু বাসায় বাবা রোজ মাটিতে পড়ে যায় জ্বর নিয়ে, মা ধান শুকায় বাড়ির রাস্তার পাশে।
সে দিনের পর থেকে রুপসার সাথে দেখা হয় কম।
কখনও কলেজ শেষে বাঁশঝাড়ের পাশে, কখনও চিঠির মত এক টুকরো কাগজ।
একবার রুপসা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল—
“তুই যদি কিছু হতিস… আমি সব ছেড়ে দিতাম…”
রিফাত শুধু বলেছিল,
“তুই আমার পৃথিবী, কিন্তু আমি তোর যোগ্য হইনি।”
রুপসা আর কলেজে আসেনি।
এক সপ্তাহ পর খবর ছড়ায়—বিয়ে হয়ে গেছে।
লাল শাড়ি পরে, সাদা গাড়িতে চেপে সে চলে গেছে শহরের দিকে।
রিফাত সেই দিন বিকেলবেলা একা চলে গিয়েছিল বাঁশঝাড়ের পাশের ঘাটে।
পকেটে ছিল সেই শেষ চিঠি, যেটাতে রুপসা লিখেছিল—
❝
“তুই থাকবি আমার গল্পের পাতায়…
যেখানে কেউ থাকলেও ছুঁতে পারে না।”
❞
সেই চিঠি সে বুকের পাশে রাখে।
কিন্তু তারপর সে আর কলেজে যায়নি।
বছরটা একদম নষ্ট হয়ে যায়।
ক্লাসে অনুপস্থিতির জন্য নাম কাটা পড়ে যায়—নিজেই ভর্তি হয়নি ।
ঘরে চুপচাপ বসে থাকত, , মা কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিত না।
সারাক্ষণ জানালার পাশে বসে থেকে তাকিয়ে থাকত রাস্তার দিকে—যে পথে একদিন রুপসা হেঁটে যেত।
ঘুরে দাঁড়ানোর সকাল
হঠাৎ একদিন, হেমন্তের সকালে গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রিফাত থেমে যায়।
তার চোখে পড়ে—পাশের মাঠে একদল কিশোর ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে।
তাদের চোখে-মুখে আগামীর স্বপ্ন, কোনো প্রেম নেই, কোনো হার নেই।
সেই মুহূর্তে রিফাত প্রথমবার চিন্তা করে—
“আমি কি সারাজীবন রুপসাকে হারানোর কষ্টে ডুবে থাকব?
না কি একদিন এমন কিছু করব, যাতে কেউ আর আমার মতো হার না মানে?”
সেই সন্ধ্যায় সে নিজেই যায় কলেজে।
পুনঃভর্তি চায়।
স্যার অবাক হয়ে বলে—“আবার লেখাপড়া করবি তাহলে?”
রিফাত এক লাইনেই উত্তর দেয়—
“এবার আমি হারব না, স্যার।”
শেষ জয়
পরের বছর রিফাত এমন মন দিয়ে পড়তে থাকে, যেন তার সমস্ত কষ্ট, অপমান আর শূন্যতা শুধু একটা কাজে লাগাতে চায়—নিজেকে গড়তে।
বাঁশঝাড়ের পাশে বই খুলে পড়ে সে, রাতে কুপি জ্বালিয়ে লেখে, আর মাঝে মাঝে তাকায় খোলা আকাশের দিকে—যেখানে হয়ত রুপসা নেই, কিন্তু তার স্বপ্নের কিছু ছায়া থেকে গেছে।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার দিন…
৩১টা ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে
রিফাতের নাম ছিল ফলাফলের শুরুর দিকেই।
তার নাম লেখে বিভাগে প্রথম হিসেবে।
পুরো কলেজে হাততালি পড়ে যায়।
প্রিন্সিপাল স্যার বলেন—
“এই ছেলেটার জয়ের পেছনে একটা না বলা গল্প আছে।”
❝
যে প্রেম আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল,
আজ আমি সেই প্রেমের কষ্টকে ছাপিয়ে গেছি।
রুপসা, তুই থাকিস গল্পে…
আমি থাকব সত্যিকারের জীবনে।
❞
এই ছিল রিফাত ও রুপসার গল্প।
যেখানে ভালোবাসা হারিয়েছে ঠিকই,
কিন্তু সেই হারানো ভালোবাসার বুকেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন জীবন।
