বইয়ের ভাঁজে রাখা ভালোবাসা
নতুন কলেজে ভর্তি হয়েছে আবির। পুরনো একটা সরকারি কলেজ, খোলা বারান্দা, ধুলো ধুলো বেঞ্চ, জানালায় মাইলের পর মাইল সবুজ মাঠ আর দূরে কুয়াশার মতো একটানা ধানক্ষেত।
ক্লাসের প্রথম থেকেই বেশ সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল।মাঝে মাঝে সে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়ত,অনেক সময় ক্লাসের পড়া আর মাঝে মধ্য বিভিন্ন সাহিত্য ও গল্পের বই পড়ত।একদিন লাইব্রেরী থেকে সে একটা বাংলা কবিতার বই নেয় — জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’। বইটা বেশ পুরনো, পাতাগুলোয় কালি মাখা দাগ, কিছু জায়গায় ভাঁজ। বাসায় এসে যখন সে বইটা উল্টে পাল্টে দেখছিল, হঠাৎ একটা পাতার মাঝখান থেকে পড়ে গেল হলুদ হয়ে যাওয়া এক টুকরো কাগজ।হাতে নিয়ে দেখল সেটা ছোট একটা চিরকুট ।
কাগজটা ছেঁড়া ডায়েরির পাতায় লেখা।
“তাকে বলতে ইচ্ছে করে,
কিন্তু কেমন যেন সাহস হয় না।
তার হাসিমুখটা যেন দিনের একমাত্র আলো—
কিন্তু সে তো জানেই না আমি আছি…”
– তৃষা সময়কাল ০৯/০২/২০১৯
লেখার নিচে আর কোনও নাম নেই। কিন্তু চিরকুট থেকে বোঝা যায়, এটা একটা মেয়ের লেখা কারণ যে লিখেছে তার নাম দেয়া সেখানে।তার ভাষায় একধরনের কোমলতা, অনুভবের ভেতরে লাজুকতা আছে। এবং এই লেখার প্রতিটি অক্ষর বেশ সময় নিয়ে সুন্দর করে লেখা ।
একই সাথে নামটা বেশ পরিচিত মনে হয় তার।
আবির চিঠিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। জানে, এটা হয়তো কারও ফেলে যাওয়া কাগজ — কিন্তু এমন আবেগ, এমন ভাষা, এমন আকুতি।আবিরের ভেতরে কেমন যেন একটা অদ্ভুত আকর্ষণ জাগায়।
এরপর প্রতিদিন ক্লাস শেষে আবির লাইব্রেরিতে যায়। একই র্যাক থেকে অন্য পুরনো বই খোঁজে। যদি ওই চিঠির মতো কিছু আর পাওয়া যায়। কিন্তু আর কিছু মেলে না।
তবে সময়ের সাথে সে লক্ষ্য করে, তার ক্লাসে তৃষা নামে একটা মেয়ে আছে।
তৃষা, একেবারে অন্যরকম সুন্দরী। গায়ের রং মধুর মতো উজ্জ্বল, মুখে একধরনের শান্ত অভিব্যক্তি, চোখে যেন একটা ছায়ার মতো দুঃখ লুকিয়ে থাকে। সে বেশ চুপচাপ — সবসময় বইয়ের সাথে মাখামাখি, আর লাইব্রেরিতে অনেক সময় কাটায়।
আবির বুঝতে পারে না কেন, কিন্তু তার মনে হতে থাকে… চিঠিটার লেখক কি তৃষা?
একদিন লাইব্রেরির জানালার ধারে বসে থাকা তৃষাকে দেখে আবিরের মনে পড়ে যায়,
চিঠিটা যেভাবে বইয়ের পাতায় ছিল, মনে হচ্ছিল তা বইয়ের ভিতর ইচ্ছা করে রাখা হয়নি — হয়তো জানালায় বসে লিখছিল, হঠাৎ কেউ আসায় পাতার মাঝে গুঁজে রেখেছিল… আর সেখানেই থেকে গেছে।
দিন কেটে যায়।
তৃষার প্রতি একধরনের টান অনুভব করে আবির — কিন্তু সে জানে না কেন, সেই চিঠির লেখা কথাগুলো তার মনেই বারবার বাজে। সেও বলতে চায়, কিন্তু সাহস করে না। প্রতিবার চায়, তৃষাকে জিজ্ঞেস করি, ওই চিঠি কি তার?
কিন্তু তৃষার চোখে যে গভীরতা, সেই চোখের দিকে তাকিয়ে সে কিছুতেই কিছু বলতে পারে না।
কলেজের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবির একটা কবিতা পড়ে— যার কিছু লাইন সে নিজে লেখে, কিছু চিঠি থেকে তুলে আনে।
“তোমাকে দেখেছি প্রতিদিন,
কিন্তু কোনোদিন ছুঁয়ে দেখিনি —
তোমার নীরবতা আমার সবচেয়ে কাছের শব্দ।”
তৃষা সেই অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসে। কবিতা শুনে সে যেন একটু চমকে ওঠে। কিন্তু মুখে কিছু বলে না।
দিনশেষে আবির দেখল তৃষা একা মাঠে বসে, গোধূলি আলোয় নিজেই নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
ততদিনে হৃদয় বুঝেছিল সেই চিরকুটটা লেখা তার জন্য ।
সেই দিনই আবির সাহস করে তৃষার সামনে গিয়ে বসে। বলে না কিছুই।
শুধু চুপচাপ চিরকুটের কপি বের করে তৃষার হাতে দেয়।
তৃষা সেটা দেখে কিছুক্ষণ স্তব্ধ। এরপর কাঁপা গলায় বলে,
“তুমি এটা কোথায় পেলে?”
আবির বলে, “রূপসী বাংলা’র একটা পুরনো কপিতে। হয়তো কারও রেখে যাওয়া…”
তৃষা মাথা নিচু করে বলে, “আমি তখন কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন ছিলাম। সবাই কেমন জানি অপরিচিত লাগত। একটা ছেলে ছিল, হাসলে মন ভালো হয়ে যেত… কিন্তু বলা হয়নি। একদিন এই লাইব্রেরিতেই লিখছিলাম। তারপর ভুলে… রেখে গেছি হয়তো।”
আবির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
আমিই কি সেই ছেলেটা ? আমি প্রতিদিন তোমার সেই চিরকুট পড়েছি। এখন আমি তোমার মনের চিঠিটা পড়েছি, আমারটা তুমি কি শুনবে না?
তৃষার চোখে জল চলে আসে। সে বলে,
আমি অনেকবার বলতে চেয়েছি,কিন্তু ভয় পেতাম। আবার যদি হারিয়ে ফেলি ।
আবির বলে, “এইবার হারানোর ভয় নেই।”
সেই দিন থেকে দুজনের গল্প শুরু হয় — একেবারে অন্যভাবে।
তাদের সম্পর্কটা ছিল একধরনের বোঝাপড়া, অনুভবে ভরা, কোনো চটকদার প্রেম নয় — বরং সেই বইয়ের পাতায় লেখা ভালোবাসার মতো।
কলেজের শেষ বর্ষ পর্যন্ত — তৃষা আর আবির একসাথে ছিল, বইয়ের ভাঁজে রাখা সেই ভালোবাসাকে বুকে নিয়ে।
শেষ কথা
তৃষা এখনও তার প্রিয় বইয়ের মাঝে রেখে দেয় ছোট ছোট কাগজে লেখা অনুভূতি।
আবির বলে — “ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য চিৎকার দরকার হয় না, শুধু একটা পাতাও যথেষ্ট… যদি সেটা হৃদয়ের ভাষায় লেখা হয়।”
🖋️
গল্পের বার্তা:
প্রেম অনেক সময় প্রকাশহীন থাকে, কিন্তু যদি সত্যি হয়, একদিন না একদিন সেটা ঠিক ঠিক খুঁজে নেয় তার পথ — হয় বইয়ের ভাঁজে, হয় চোখের ভাষায়।
