ধুলো মাটির ফুল (দ্বিতীয় পর্ব)
স্কুলের বারান্দায় সেদিন অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এসেছে। প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা হতে যাচ্ছে। শিক্ষক মঞ্চে দাঁড়িয়ে খাতার পাতা উল্টে তাকালেন ছাত্রছাত্রীদের দিকে। চন্দ্রাবতীর বুক দপদপ করছে। চারপাশে ফিসফাস, হাসিঠাট্টা কেউ কারও নাম ধরে বাজি ধরছে, আবার কেউ চুপচাপ অপেক্ষা করছে। কিন্তু চন্দ্রাবতীর দৃষ্টি একেবারে খাতার পাতায় আটকে আছে। যেন এই মুহূর্তে চারপাশের পৃথিবী থেমে গেছে।
অবশেষে শিক্ষকের গলা ভেসে এল
“প্রথম হয়েছে চন্দ্রাবতী হরিপদ মণ্ডলের মেয়ে।”
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ যেন জমে গেল। তারপর করতালির ঝড় উঠল। বন্ধুরা চেঁচিয়ে উঠল, কেউ অভিনন্দন জানাতে দৌড়ে এল, কেউ খাতা দেখতে চাইলো। চন্দ্রাবতীর মুখ লাল হয়ে গেল, চোখে চিকচিক করল অশ্রুর ঝিলিকে। এ যেন শুধু প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার জয় নয়, বরং তার জীবনের বহুদিনের লুকোনো স্বপ্নের প্রথম আলো।
শিক্ষক মৃদু হেসে তার কাঁধে হাত রেখে বললেন “চন্দ্রাবতী, তুমি শুধু লেখায় নয়, মনের জোরেও সবার থেকে আলাদা। জেলা পর্যায়ে গিয়ে তোমাকে প্রমাণ করতে হবে।”
শিক্ষকের চোখে গর্ব আর আশার ছাপ দেখে চন্দ্রাবতীর বুক ভরে উঠল। মনে হল, তার ছোট্ট লেখার ভেতর দিয়ে গ্রাম, সংসার, স্বপ্ন সব কিছুর কথা যেন পৌঁছে গেছে সবার কাছে।
সেদিন বিকালে বাড়ি ফেরার পথে তার মন ছিল একেবারে অন্য রকম। কাঁধের খাতার বোঝা যেন হালকা। পথের কাদা, ধুলো, কাঁটাঝোপ—কিছুই আর ভারী লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, সে শুধু হাঁটছে না, বরং উড়ছে।
কিন্তু উঠোনে ঢুকতেই বাস্তবতার কষাঘাত তাকে থামিয়ে দিল।
বাবা বারান্দায় পিঁড়ি পেতে বসে আছেন, হুকার পাইপে ধোঁয়া টানছেন একের পর এক। চোখ-মুখে গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ। মা তার পাশে বসে দু’হাত মাথায় ভর দিয়ে নিশ্চুপ। ঘরে চাল ফুরিয়ে এসেছে, ধানের দাম পড়ে গেছে। ছোট ভাই রতন স্কুলে যাওয়ার জন্য নতুন জুতো চাইছে, আর শ্যামলী কাঁদছে খাতার পাতার জন্য।
চন্দ্রাবতী দাঁড়িয়ে থাকে দরজার কাছে, হাতে খাতা শক্ত করে ধরা। স্কুলে পাওয়া আনন্দের ঝলকানি মুহূর্তেই নিভে যায়। মনে হয়, আলোয় ভরা আকাশ থেকে হঠাৎ মেঘ নেমে এসেছে।
মা ধীরে ধীরে মুখ তুলে বললেন—
“চন্দ্রা, স্কুলে গেলেই তো খরচ বাড়ে। বই, খাতা, কলম—সব কিনতে হয়। তোর বাবার এই টানাটানির সংসারে কতটুকু সম্ভব বল?”
বাবা হুকার পাইপ নামিয়ে বললেন—
“মেয়েমানুষের এত পড়াশোনা করার কি দরকার? দুই-চার বছর পরেই তো সংসার সামলাতে হবে।”
চন্দ্রাবতীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে কিছু বলতে গেল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হল না। শুধু মনে হল, স্বপ্ন কি তাহলে কেবল বইয়ের পাতায় লেখা থাকবে? সংসারের অভাব কি সত্যিই তার আলোকে নিভিয়ে দেবে?
রাত গভীর হলে উঠোনে এসে দাঁড়াল সে। দূরে বাঁশঝাড়ে ঝিঁঝিঁর ডাক, বাবার হুকার গুড়গুড় শব্দ, আকাশভরা তারা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নির্জনতা। বুকের ভেতর একটা ছোট্ট আলো ফিসফিস করে বলল—
“না, আমি থামব না। আমি এগোব।”
পরদিন সকালে আবার নতুন ব্যস্ততা। ভোরে পুকুর থেকে জল তোলা, হাঁড়ি-পাতিল মাজা, রান্নাঘরে মাকে সাহায্য—সব কিছু আগের মতোই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার মন জ্বলজ্বল করছে। জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় যেতে হলে তাকে আরও ভালো লিখতে হবে, আরও গভীর কিছু ভাবতে হবে।
স্কুলে গিয়ে সে শিক্ষকের কাছে জানাল—
“স্যার, আমি চেষ্টা করব জেলা পর্যায়ে কিছু করার।”
শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন—
“চেষ্টা করলেই হবে না, তোমার ভেতরে যে আগুন আছে, তাকে শিখা করে তুলতে হবে।”
চন্দ্রাবতী খাতার পাতায় নতুন করে লিখতে শুরু করল। ভোরে উঠে কাজ শেষ করে, রাতে সবাই ঘুমালে কুপির আলোয় বসে লিখত। কখনো গ্রামের মাঠ, কখনো ধানের গন্ধ, কখনো সংসারের টানাপোড়েন—সব তার লেখার মধ্যে ঢুকে পড়ে।
কিন্তু সংসারের চাপও কম নয়। একদিন দুপুরে মা রাগ করে বললেন—
“দিনরাত খাতার ওপর মুখ গুঁজে থাকিস। তুই যদি কাজে সাহায্য না করিস, সংসার চলবে কেমন করে?”
চন্দ্রাবতী চুপচাপ কাজ করতে থাকে। ভেতরে ভেতরে কষ্টে বুক ভরে ওঠে, তবু জানে—মা সত্যিই কষ্টে আছেন।
এমন সময়ে একদিন স্কুল থেকে ফিরে শুনল, গ্রামের মাঠে ধান নষ্ট হয়েছে বন্যার জলে। বাবা বসে আছেন মাথা নিচু করে, হুকার ধোঁয়া গায়ে মাখিয়ে। মা কাঁদছেন চুপচাপ। সংসারে তখন অচিন্তনীয় দুর্দশা।
সেদিন রাতে ডায়েরির পাতায় চন্দ্রাবতী লিখল—
“আমি জানি, আমাদের ঘরে অভাব আছে। কিন্তু স্বপ্ন কি শুধু ধানের দামের সঙ্গে বাঁধা? আমি যদি শিক্ষক হতে পারি, তবে একদিন হয়তো সংসারের এই অভাব দূর হবে। আমি শুধু আমার জন্য নয়, পুরো গ্রামের জন্য আলো ছড়াতে চাই।”
লিখতে লিখতে তার চোখ ভিজে গেল। খাতা ভিজল অশ্রুজলে। কিন্তু সেই জলেই যেন অদ্ভুত শক্তি লুকিয়ে ছিল।
পরের দিন স্কুলে শিক্ষক বললেন,
“চন্দ্রাবতী, জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতার তারিখ ঠিক হয়েছে। তোমাকে প্রস্তুতি নিতে হবে।”
চন্দ্রাবতীর বুক দপদপ করতে লাগল। মনের ভেতরে একদিকে স্বপ্নের আলো, অন্যদিকে সংসারের অন্ধকার। কেমন করে সামলাবে সে?
তবু সে জানে—পথ যতই কঠিন হোক, তার ভেতরে যে ছোট্ট আলো জ্বলছে, তাকে নিভতে দেওয়া যাবে না।
সন্ধেবেলা উঠোনে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। মনে হয়, সেই চাঁদ যেন তার স্বপ্নকে আলো দিচ্ছে। তার মনে বারবার বাজতে থাকে—
“আমি চন্দ্রাবতী। আমি ধুলো-মাটির ফুল। ঝড়-ঝাপটা যতই আসুক, আমি ফুটবই।”
