গ্রামের আকাশটায় সেদিন যেন কেমন একটা ভারী আবহ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, কিন্তু চন্দ্রাবতীর মনটা তেমন আলো পাচ্ছিল না। উঠোনে প্রদীপ জ্বলে উঠেছে, বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ মিশে আছে। তবু তার চোখ-মুখে অদ্ভুত ক্লান্তি। সারাদিন কাজ, স্কুলের চাপ—সব মিলিয়ে শরীর ক্লান্ত হলেও বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলছে, তা তাকে শান্ত হতে দিচ্ছিল না।
আজ বাবা-মায়ের সঙ্গে কথাটা বলেই সে বুঝেছিল, পথ কত কঠিন। বাবা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন, মা চোখ নামিয়ে ছিলেন। সংসারের টানাপোড়েনের কাছে তার প্রবন্ধ, তার স্বপ্ন যেন একেবারেই ক্ষুদ্র হয়ে গেল।
চন্দ্রাবতী বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। দূরে বাঁশঝাড় থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছিল। ঘরে হরিপদ হুকায় টান দিচ্ছেন একের পর এক, ধোঁয়ার আস্তর মুখ ঢেকে ফেলছে। গৌরী হাঁড়িতে ভাত বসাচ্ছেন, কিন্তু চোখের নিচে গভীর ক্লান্তি। শ্যামলী লাটাই ঘোরাচ্ছে, আর রতন মাটিতে খাতার পাতা ছড়িয়ে বসে আছে।
হঠাৎ করেই পাশের বাড়ি থেকে শব্দ এলো। খকখক কাশি, তারপর পায়ের শব্দ। অল্প সময়ের মধ্যেই উঠোনে প্রবীণ প্রতিবেশী কানাই কাকা এসে দাঁড়ালেন। কাঁধে পুরনো গামছা, পরনে মলিন ধুতি, মুখে সদা হাসি। বয়স তার ষাট পেরোলেও গ্রামের প্রতি টানটা আজও অটুট।
“হরিপদ, বসে আছিস ক্যান রে? মুখটা কেমন মলিন লাগতেছে।” – কাকা কথা শুরু করলেন।
হরিপদ মুখ তুলে তাকালেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কিসের মুখ দেখাই কাকা? সংসার চালাতে পারি না, তার ওপর আবার মাইয়ার শহরে যাইতে কইছে মাষ্টারমশাইরা যাওয়া-আসার খরচের চাপ। লোকে জানলে হাসাহাসি করবে। মাইয়ার স্বপ্ন তার বইয়ের পাতাতেই থাকুক।”
চন্দ্রাবতী শুনছিল সব কথা। বুকের ভেতর যেন কারও ভারি হাত রাখা আছে—শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
কানাই কাকা চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর মাটিতে পিঁড়ি টেনে বসলেন। গলা একটু ভারী করে বললেন,
“শোন হরিপদ, গরিব বলেই কি স্বপ্ন মরবে? তোর মাইয়া ছোটবেলা থেইকাই দেখছি। খালি বইয়ের পিছে পড়ে থাকে। মাটির কাজ করে, সংসারের ভার সামলায়, তারপরও খাতা-কলম ছাড়ে না। এমন জেদি মাইয়া একদিন না একদিন আলো আনবেই।”
হরিপদ এবার মুখ তুললেন। চোখে জমে থাকা দুশ্চিন্তা যেন ধোঁয়ার চেয়েও ঘন।
“কাকা, তুই বুঝবি না। সংসার টানতে পারি না, খাওয়াই মুশকিল। তার মধ্যে আবার শহরে পাঠানো? খরচের বোঝা কে বহন করবে?”
কানাই কাকা হেসে ফেললেন। দাঁতের ফাঁকে আলো ঝিলিক দিল।
“খরচের চিন্তা কিসের? আমি আছি। যতটুকু লাগে, আমি দেব। তোরে এক পয়সা ভাবতে হবে না। ফসল বেচে কিছু জমানো টাকা আছে আমার। মাইয়া যদি আলো ধরতে পারে, সেই আলো তো এই গ্রামকেই আলোকিত করবে।”
কথাগুলো শুনে গৌরীর হাত থেকে চামচ পড়ে গেল। তিনি চুপ করে কাকাকে দেখলেন, চোখে জল এসে গেল। এতদিন সংসারের টানাপোড়েনে যে আশা প্রায় নিভে যাচ্ছিল, হঠাৎ সেই আশাই যেন আবার জ্বলে উঠল।
চন্দ্রাবতী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে কানাই কাকার পা ধরে বসে পড়ল। গলা কেঁপে উঠল,
“কাকা, আমি প্রতিজ্ঞা করছি। আমি যদি শহরে গিয়ে কিছু করতে পারি, তবে একদিন এই গ্রামের প্রতিটি ছেলেমেয়েকে পড়াশোনার পথে টেনে নিয়ে যাবো। আমি শুধু নিজের জন্য চাই না, চাই আমার এই গ্রাম যেন অন্ধকার থেকে বের হয়।”
কানাই কাকা মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তুই ধুলো-মাটির ফুল, চন্দ্রা।তোর এই বাপের ঘর ধুলো মাটি ছাড়া কিছুই না । ঝড় আসুক বাধা আশুক্ন, তুই ফুটবিই। তোরে কেউ থামাইতে পারবে না।”
হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। মুখের ওপর ধোঁয়ার আস্তরণ নামছিল, কিন্তু চোখে জল চিকচিক করছিল। অবশেষে তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
“ঠিক আছে কাকা। যদি তুই সহায় হইস, তবে আমি কিছু বলব না। তবে মাইয়া, মনে রাখবি—এ পথ সহজ না।”
চন্দ্রাবতীর বুকের ভেতর থেকে ভার যেন নেমে গেল। মনে হল, এতদিন ধরে যে স্বপ্নগুলো শেকলবন্দি হয়ে ছিল, আজ তারা ডানা মেলতে শুরু করেছে।
সেই রাতটা তার কাছে একেবারেই আলাদা হয়ে গেল। আকাশভরা তারার দিকে তাকিয়ে মনে হল, প্রতিটি তারা তার ডায়েরিতে লেখা শব্দগুলোর মতো। ছোট, ক্ষুদ্র, তবু আলো ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে।
খাতার পাতায় লিখল—
“আজ কানাই কাকা আমার জীবনের পথ আলোকিত করল। হয়তো সবটুকু পারব না, তবু চেষ্টা করব। কারণ আমি ধুলো-মাটির ফুল। কাদা-মাটিতে জন্মেছি, তবু আলোয় ফুটতে শিখব।”
মা এসে পাশে বসে চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফিসফিস করে বললেন,
“মা, তোর এই জেদ হয়তো একদিন আমাদের জীবন পাল্টাবে। আমি তোর পাশে আছি।”
চোখের কোণ ভিজে উঠল চন্দ্রাবতীর। দূরে বাঁশঝাড়ে বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছিল, যেন প্রকৃতিও তার স্বপ্নকে আশীর্বাদ দিচ্ছে।
এভাবেই গ্রামের নিস্তব্ধতা ভেদ করে এক নতুন আলো জন্ম নিল।
{ চন্দ্রাবতী কি পারবে গ্রামের নিভু আলো উজ্জল করতে? জানতে হইলে যুক্ত থাকুন গল্পগ্রামের সাথে }
