কলেজের প্রথম সকাল। সূর্যের প্রথম কিরণ মিশে যাচ্ছিল নতুন আশার আলোয়। রিয়াদের পা টলমল করছিল অচেনা মাটিতে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে ছিলো এক একটা স্বপ্নের ছোঁয়া। নতুন কলেজ, নতুন বইয়ের গন্ধ, নতুন মুখ, নতুন ড্রেজ—সবকিছু যেনো এক সুরে গান গাইছিল জীবনের নতুন অধ্যায়ের।
রোদ্দুর ভেজা আকাশ, গাছের পাতার কোপাল ছোঁয়া বাতাস—সব মিলিয়ে যেন জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। কিন্তু রিয়াদের অন্তরে যেন সেই নতুনতার চেয়েও গভীর এক নিঃসঙ্গতা বুকে ভর করে আছে।
রিয়াদের মনে প্রেমের কোনো স্পর্শ আসেনি, কোনো দিন ভালোলাগা বা মনের মতো কাউকে দেখার বাসনাও হয়নি। বন্ধুদের হাসিখুশি প্রেমের কথাবার্তা, মেয়েদের কথাগুলো তার কাছে ছিল দূরের কোনো জগতের কথা।
কলেজের নতুন বেঞ্চে বসে রিয়াদ যেনো সারা পৃথিবী থেকে একদম আলাদা এক জায়গায় আকাশের নীচে অদৃশ্য এক বলয় বেঁধে বসে আছে। পাশের বেঞ্চ থেকে হাসাহাসি আর গল্পের আওয়াজ আসছিল, কিন্তু তার মন ছিল একাকী, নিরিবিলি। তার চোখ ছিল একটা মুক্তাকাশ, যেখানে কোনো রঙ নেই।
এভাবে চলতে লাগল তার নতুন কলেজ নতুন ক্লাস তার নতুন বন্ধুদের সাথে বেশ।
প্রতিদিনের মতো বাংলা ক্লাস করতে এক ভবন থেকে অন্য একটি ভবনের ২য় তলায় যাই ,যেখানে ছেলে,মেয়ে একই সাথে ক্লাস করে বড় একটা হল রুমে ।
একদিন বাংলা ক্লাসে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল পাশের বেঞ্চে বসা এক মেয়ের দিকে।যাকে সে আগে কখনো দেখেনি। মেয়েটির চুল সোনার মতো ঝলমল করছিল, আর চোখের ভেতর ছিল এক গভীর আকাশের নীলে চাওয়া স্বপ্ন। মেয়েটি যেনো তার নিজের এক অন্য জগতের ছবি। চোখে তার একধরনের নির্ভীকতা মিশে ছিল, অথচ মুখে লাজুক একটা হাসি।
মনে মনে রিয়াদ চিন্তা করল কে এই মেয়েটি , আগে তো কখনও দেখিনি । নতুন , নাকি আমি আজ প্রথম দেখছি !
রিয়াদের কৌতূহল বেড়ে গেল। সে পাশের বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, মেয়েটা কে রে?
বন্ধু হেসে বলল,ওর নাম মোহমায়া, কিছু দিন হচ্ছে এসেছে কলেজে।
রিয়াদ প্রশ্ন করল তার বন্ধুকে তুই ওকে আগে দেখেছিস?
বন্ধু বলল _হুম কিছু দিন যাবত হলো আসছে কিন্তু কেন ?
না, প্রথম দিনই দেখলাম তাই জিজ্ঞাসা করলাম আর কি।কিন্তু ওর কথা শুনলে তুই হতবাক হয়ে যাবি। ও একটু রহস্যময়ী, আর আমাদের কলেজের একটা ভিন্ন জায়গায় একাই বসে থাকে।তেমন কারোর সাথে মিশতে দেখি না ।
রিয়াদ চিন্তা করল, এ মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় হওয়া উচিত। প্রেমের জায়গায় এতদিন সে নিজেকে রেখেছিলো বিচ্ছিন্ন, কিন্তু মোহমায়ার দিকে তাকিয়ে যেন তার হৃদয়ে ধীরে ধীরে কোনো আগুন জ্বলে উঠল।
বন্ধু ফাজলামি করে বলল, “তোর কি দরকার এসব? প্রেম ট্রেম করবি নাকি? আর করলেও এসব তো ঝামেলা ছাড়া কিছু না।
রিয়াদ মনে মনে চিন্তা করে বন্ধুর কথার উত্তরে একটা হাসি দিয়ে বলল নাহ তেমন কিছুই না ।কিন্তু মোহমায়া যেন তার জীবনের অচেনা গান হয়ে এলো। সে ভাবতে লাগল, যদি কখনো সেই গানের সুর ধরতে পারে।
কিন্তু দিন যেতে লাগল। ক্লাসে, করিডোরে, লাইব্রেরির সিঁড়িতে, কিংবা হোস্টেলের বারান্দায়—যেখানেই মোহমায়াকে দেখত, তার চোখ অজান্তেই কিছুটা সময় আটকে যেত।হয়তো চুলে হাত দেওয়ার ভঙ্গি, কিংবা নির্লিপ্ত মুখের সেই শান্ত হাসি—সব মিলিয়ে এক অজানা টান জন্ম নিল রিয়াদের মনে।
দিনের পর দিন, ক্লাসে মোহমায়ার সঙ্গে দেখা হলে রিয়াদের চোখে তার ছোঁয়া বেড়ে গেল। একদিন নিজের অজান্তেই সে বলল, তুমি কি আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে? কিছু বলার ছিলো। সাভাবিক ভাবে রিয়াদ আলাপ জুড়তে থাকল লেখাপড়া নিয়ে ক্লাস নিয়ে , এবং তাদের পূর্বের স্কুল নিয়ে তাদের বাড়ি কোথায় ,কে কে আছে পরিবারে । এভাবেই আগাতে লাগল তাদের কথপোকথন ।
তাদের মধ্যে আলাপ বাড়তে থাকল, বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। ভালোবাসার সুরগুলো মৃদু মৃদু বাজতে লাগল, তবুও হৃদয়ের এক কোণে ছিলো এক গভীর অনিশ্চয়তা—ধর্ম আর সমাজের চোখ।
মোহমায়া হিন্দু, আর রিয়াদ মুসলিম। এ বাস্তবতা ভালোবাসাকে আরও নাজুক করে তুলছিল। কেউ জানতো না রিয়াদের মনের প্রেমের গোপন কথা, ভয় কাজ করতো প্রত্যেক মুহূর্তে।
অবশেষে একদিন সাহস করে বলেই ফেলল—
মোহমায়া আমি তোমাকে পছন্দ করি। খুব!
মোহমায়া অবাক হয়ে তাকাল, তারপর নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
— “না, রিয়াদ। এটা সম্ভব নয়।”
সেদিন ফিরতে ফিরতে রিয়াদের মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা ভর করল। কিন্তু সে হাল ছাড়ল না। বন্ধুদের দিয়ে কথা বলানো, মাঝেমধ্যে চিরকুট পাঠানো, আড়ালে-আবডালে যত্নের বার্তা—সব মিলিয়ে এক বছরের দীর্ঘ চেষ্টা শেষে অবশেষে মোহমায়া রাজি হলো।
এক বছর কেটে গেল,
ভালোবাসার অম্লান ছোঁয়ায়। একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, ক্লাসে একসঙ্গে বসা, অজস্র মুহূর্তে হাতের মুঠোয় মুঠো মিলানো—সবকিছু তার জীবনের এক অমূল্য ধন।
ভালোবাসা যেন গভীর থেকে গভীরে যেতে থাকল ।
কিন্তু একদিন মোহমায়ার বাবা এ সম্পর্ক জানতে পারলেন। রাগে অগ্নি স্ফুলিঙ্গ ঝরালো তার কথায়, রিয়াদের বাবা শান্ত স্বভাবের হলেও বললেন, “সমাজের নিয়ম-কানুন আছে, এগুলো ভাঙা যায় না।”
তবুও রিয়াদ আর মোহমায়া হার মানলেন না। তারা ভাবল, নিজেদের মত করে বিয়ে করবে, সমাজের চোখের অজানা কোণে ভালোবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবে।
ধর্মের দেয়াল তাদের মাঝে যেমন বাড়ছিল, তেমনি সমাজের প্রতিবন্ধকতা গজিয়েছিল চারপাশে। পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা আসতে লাগল। একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন বুনতে লাগল, কিন্তু বাস্তবতা চাপিয়ে দিল ভিন্ন চাহনি।
মোহমায়াকে হঠাৎ তার পরিবার বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দিল। সে রিয়াদকে জানাতে পারল না। চোখে জল, হৃদয়ে ব্যথা লুকিয়ে নিয়ে মোহমায়ার বিদায় বুকে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে এক নতুন দুঃখের গল্প শুরু করল।
রিয়াদের হৃদয় ভেঙে গেল, ভালোবাসার সেই স্বপ্ন ম্লান হয়ে গেল। তার চোখে মিশে গেল সেই মোহমায়ার অবিচ্ছেদ্য ছবি। জীবন যেন থেমে গেল এক নিঃসঙ্গ সঙ্গীতের মাঝে।
