ভোরের দিকে কপোতাক্ষ যেন নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে। কাশের ডগায় কুয়াশা, বালির চরের ওপর পাখির হালকা পদচিহ্ন। ঘাটের সিঁড়িতে শিশির জমে আছে; পা দিলে টুকুন শব্দ হয়। এই সময়ে সুব্রত গরুর দড়ি হাতে নদীর পাড়ে আসে—এক কাঁধে বই, আরেক কাঁধে সংসারের ভার। সাদা শার্টের একটা বোতাম নেই; বাতাসে কাপড়টা দুলে দুলে ওঠে।
কলস কাঁখে মেঘলা আসে একটু পরে। নীল ফিতে চুলে, কপালে ছোট্ট টিপ। জলে কলস ডুবিয়ে সে যখন তুলে নেয়, সূর্যের কাঁচা আলো কলসের গায়ে উঠে এসে নীলচে দাগ ফেলে।
—শুনলে, আজ ইংরিজির টেস্ট?
—শুনলাম। খাতার কভার ছিঁড়ে গেছে।
—আমার বাড়তি আছে। কাল নিয়ে এসো।
এইটুকু কথা। তবে নদীটা জানে, এমন কথা থেকে কখনও কখনও একটা অদৃশ্য সাঁকো গড়ে ওঠে।
সুব্রতের বাড়ি মাটির তাতে খড়ের ছাওনি; দেওয়ালে ধানের আঁশটে গন্ধ। বাবা শ্রীচান বর্গাচাষ করেন, মা সরস্বতী দেবী হাঁপানিতে কাঁপেন। রাতে কেরোসিনের আলোয় সুব্রত পড়তে বসলে মায়ের কাশি থেমে থেমে শোনা যায়। বাইরে বাঁশবনে পেঁচা ডাকছে।
—এইসব পড়া করে কী হবে রে?—মা বলেন—ভোরে গরু নিয়ে মাঠে যাবি তো?
—যাবো। পড়াটা একটু…—বাকিটা সে বলে না। জানে, কথায় লাভ নেই; কাজই কথা।
স্কুলে মাস্টারমশাই কড়া, কিন্তু চোখে স্নেহ। খাতায় লাল কালিতে লিখে দেন—“ভালো!” তবু পরীক্ষার ফি-র কথা উঠলেই সুব্রতর বুকের ভেতরটা কেমন ছোট হয়ে আসে। শেষ তারিখের আগের দিন বিকেলে সে নদীর ধারে বসে থাকে, গরু দুটো জল খায়, পালের ঘন্টা টুনটুন করে বাজে। আকাশে তখন সাদা মেঘ যাচ্ছে ধীরে।
পরদিন স্কুলে গিয়ে দেখে, তার রোল নম্বর ঠিকঠাক। কে ফি দিল—কেউ বলে না। হেডস্যার কেবল তাকিয়ে হাসেন, চোখের কোণায় পিছনে যে নরমতা থাকে তা ঝিলিক দিয়ে ওঠে। মেঘলা বারান্দার দিকে দাঁড়িয়ে ছিল; চোখাচোখি হলো, মাথা ঝুঁকাল। এইটুকুতেই অনেক কথা হয় কখনও কখনও।
পরীক্ষা পেরুনোর পর বর্ষা এল। নদী ফুলে উঠল, চরের পারে ভাঙন ধরল। কাশফুল মাথা নিচু করল। এক বিকেলে মেঘলা বলল—
—শহরে কলেজে ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। বাবা বলেছে দেখতে।
—যাও, দেখে এসো।
—তুমি যাবে না?
সুব্রত হাসল—
—আমার শহর কপোতাক্ষই। এর ওপারে যেতে ভেলা লাগে, শহরে যেতে লাগে টাকা। দুটোই এখন নেই।
মেঘলা শহরে গেল। বাস জানালায় সে গালে হাত রেখে বসে ছিল; রাস্তার দু’ধারে ধানখেত, পুকুর, বাঁশবন পেছনে সরে যেতে থাকে। কলেজের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে তালিকা দেখল; ভিড়ের ভিতরেও তার মনে হলো এই নৈশব্দ্য কোথা থেকে আসে? হয়তো নদী কখনও কখনও শহর অবধি হাওয়া পাঠায়।
সুব্রতোর বাড়ির কাজ মাঠের কাজ দিনে দিনে বাড়াল। ভোরে মাঠ, দুপুরে খেতের ধারে ঝাঁটা, সন্ধ্যায় দুই-চারটি বাচ্চাকে নিয়ে বাঁশতলায় বসে অক্ষর শেখায়। খাতার পাতায় সে ‘আ’ লিখে বলে—
—এটা শুধু অক্ষর না; বাড়ির দরজার মতো। খুলতে পারলে বাকিটা খোলা থাকে।
বাচ্চারা হেসে ওঠে। হাসির শব্দে বাঁশপাতা যেন কেঁপে ওঠে।
একদিন দুপুরে খবর এল—মেঘলার বিয়ে ঠিক। পাত্র শহরের, ব্যাংকে কাজ করে। পাড়ার লোকের মুখে নানা কথা, নদী কেবল চুপ করে থাকে,জল মনে হচ্ছে জমে আছে হিম ঠান্ডাতে। বিয়ের দিন সন্ধ্যায় সুব্রত ঘাটে দাঁড়িয়ে ছিল। জলের গায়ে মন্দিরের আলো লম্বা হয়ে পড়ে আছে। মনে হলো, কিছু একটা আজ থেকে একটু দূরে যাবে; তবে দূর মানেই শেষ নয়—এ কথা নদী শেখায়।
বছর দুই পরে, আষাঢ়ের মেঘে ভরা আকাশে, সই-ওয়ালা গরুর গাড়ির ঘণ্টা বেজে উঠল গ্রামে। মেঘলা ফিরছে, কোলের কাছে একটা শিশু। উঠোনে শাঁখ বাজল, নারকেল ভাঙল। দূর থেকে সুব্রত দেখল—চোখে জল এসে গেল কিনা সে বুঝতে পারল না; কেবল মনে হলো, নদীটা আজ একটু ধীরে বয়ে যাচ্ছে।
সেদিন বিকেলে ঘাটে দেখা হলো।
—এই আমার ছেলে, ঈশান।—মেঘলা বলল।
—চোখ দুটো তোমার মতো।—সুব্রত বলে ফেলল।
শিশুটি হাত বাড়িয়ে জলে ছুঁয়ে দিল; হেসে উঠল। জলের ওপর ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি হলো—বৃত্তগুলো যেন দূরে গিয়ে মিলিয়ে গেল।
—শুনি, তুমি বাচ্চাদের পড়াও?
—হ্যাঁ, বাঁশতলায়। খাতার পাতার মতো কিছু মুখ—ফাঁকা, কিন্তু সাদা।
—শহরে একটা সংস্থা আছে; পড়ার খরচ দেয়। চাইলে নাম পাঠাবো।
—পাঠাও। তবে যেন কাগজে নাম না থেকে মাথায় আশা থাকে—এইটুকু চাওয়া।
এই কয়েকদিন ঈশানকে নিয়ে মেঘলা বাঁশতলায় আসে। শিশুটি মাঝখানে বসে অক্ষর টানে; ‘ক’ যখন বানায়, কাপালিতে একটু জোর বেশি পড়ে। সুব্রত বলে—
—বেশি জোর দিলে কাগজ ফেটে যায়। অক্ষরেরও লজ্জা আছে।
সবাই হাসে।
সন্ধ্যায় মেঘলার স্বামী এলেন। ভদ্র, একটু চুপচাপ মানুষ। উঠোনে চা খেতে খেতে বললেন—
—বাচ্চাদের জন্য ব্ল্যাকবোর্ড চাইলে বলবেন।
—তা হইলে মন্দ হয় না। আর কিছু পুরোনো বই।
—পাঠিয়ে দেব।
মানুষের কথায় যখন কাজে আলো পড়ে, তখন নদী একটু গা ঢেকে হাসে—এ কথা এই গ্রামে অনেকেই জানে না।
বিদায়ের দিন কাছেই ছিল। সকালে মেঘলা বাঁশতলায় গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসে শিউলি গন্ধ ভাসছে।
—যাই?
—যাও। শহরে আলো বেশি; এখানে সেই আলো থেকে একটু জোৎস্না ধার নিই আমরা।
—তুমি ওপেন ইউনিভার্সিটিতে নাম লেখাবে?
সুব্রত একটু থেমে—
—করবো। খরচ?
—দেখে নেব। তুমি শুধু বিশ্বাস এর সাথে এগিয়ে যাও।
—চালিয়ে যাওয়া—এটাই তো সবচেয়ে কঠিন।
—কঠিন জিনিসতো তুমি নদীর থেকে শেখো।
গরুর গাড়ি চলল। ধুলো ধীরে ধীরে বসে গেল। বাঁশতলায় সেইদিন বিকেলে বাচ্চারা মিলে কাগজে ‘নদী’ শব্দ লিখল। কেউ লিখল চোখ বুজে, কেউ ধীরে ধীরে। সুব্রত বোর্ডে বড় করে লিখল—‘বিশ্বাস’—আর বাচ্চাদের বলল—
—এই শব্দটা সাঁকোর মতো। পড়ে গেলে আবার ওঠানো যায়।
কয়েক মাস পর বাঁশতলায় একটা টিনের চালা উঠল। মল্লিকবাড়ি থেকে এল ব্ল্যাকবোর্ড; শহর থেকে এল কয়েকখানা বই। পাড়ার দু’জন যুবক কাঠের তাক বানিয়ে দিল। নাম রাখা হলো—‘নীল ঘাসফুল পাঠশালা’। কে রেখেছিল কে জানে; নামটা শুনলে নদীর পাড়ে ছোট ছোট নীল ফুলের কথা মনে পড়ে—যারা বেড়ে ওঠে চুপচাপ, কারও নজর না কাড়লেও জায়গাটাকে অন্যরকম করে দেয়।
রাতে কেরোসিনের আলোয় সুব্রত পড়তে বসে। অঙ্কের সূত্র লিখে, পাশেই মাটির হাঁড়িতে রাখা জলে খাতা ভিজে না যায় বলে দূরে সরিয়ে রাখে। দূরে কার ঘরে কীর্তন—“হরি নাম…”। মা কাশি চাপতে চেষ্টা করেন। সুব্রত উঠে গিয়ে জল দেয়।
—তুই বিয়ে করবি না রে?
সুব্রত হাসে—
—পড়া শেষ হোক; তারপর দেখা যাবে।
—বই যে শেষ হয় না।
—নদীও তো শেষ হয় না।
মা তাকিয়ে থাকে; জানলার বাইরে যে তারার আলো ঢুকে পড়ে মাটির মেঝেতে, সেই আলোয় কথাটা ভেসে থাকে—“শেষ হয় না।”
শরৎ এলে কাশফুলের সাদা সাঁকো নদীর ওপরে। পূজোর ক’দিন গ্রামটা অন্যরকম। মন্দিরে ঢাক বাজে; ধুনুচির ধোঁয়ায় আকাশ ঘোলা। মেঘলা আসে ঈশানকে নিয়ে। সন্ধ্যার পর মণ্ডপের ভিড় ঠেলে তারা বাঁশতলার দিকে হাঁটে।
—তুমি বদলেছ।—মেঘলা বলে।
—মানুষ বদলায়? হয়তো চোখের অভ্যেস বদলায়।
—তাহলে চোখে কী শিখেছ?
—যা নেই, তা নিয়েও বাঁচা যায়; আর যা আছে, তা নিয়ে বাঁচতেই হয়।
ঈশান দৌড়ে এসে বলে—
—কাকু, গল্প শুনবো।
—আজ ‘দুই পাড়’-এর গল্প।
—দুই পাড়ে কে?
—এক পাড়ে দায়িত্ব; আরেক পাড়ে স্বপ্ন। মাঝখানে আমরা। স্রোত বেশি হলে বসে অপেক্ষা করতে হয়—বুঝলে কিছু ?
মেঘলার স্বামী একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি এগিয়ে এসে বললেন—
—বইয়ের তালিকা দিন; শহর থেকে জোগাড় করবো।
সুব্রত মাথা নুইয়ে হাসল।—
—বই মানুষেরও সাঁকো।
ভদ্রলোক বুঝলেন কিনা কে জানে; তবে হেসে মাথা ঝাঁকালেন।
সময়ের গায়ে ধুলো জমে, আবার বৃষ্টিতে ধুয়েও যায়। ওপেন ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা দিয়ে সুব্রত একদিন তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পায়। খুব বেশি উল্লাস তার হয় না; কেবল মনে হয়, ‘গঙ্গাফড়িংয়ের ডানায় আলো পড়েছে’—এইটুকু দেখা। বাঁশতলায় সেদিন বাচ্চাদের সে চক তুলে দিয়ে বলল—
—আজ তোমরাই লেখো বোর্ডে।
একটি ছোট ছেলে—দিবাকর—অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। তার বাবার নেই; খাতা কেনার সম্বল নেই। সুব্রত ট্রাঙ্ক থেকে পুরোনো খাতা বের করে দেয়—
—সাদা পাতাগুলো তোমার। যেগুলো লেখা, সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে তোমার গল্প লিখো।
দিবাকরের চোখে জল চিকচিক করে—
—আমি পারবো?
—তুমি বলেছিলে আমি পারবে।
শীতের সকালে নদীর ধারে কুয়াশা ঝুলে থাকে; দূরে গাছগাছালির ছায়া চুন-সাদার মতো মাটিতে ফুটে ওঠে। সুব্রত গরু নিয়ে ঘাটে আসে। ঘাটে দাঁড়িয়ে সে জলের ওপর ধূসর আলো দেখতে থাকে। মনে হয়, নদী আজ বুঝি একটু বেশি চুপচাপ। চুপচাপেরও তো কথা আছে; শুধু শব্দ নেই।
গ্রীষ্মে জল কমে গেলে মাঝচরে শিশুরা খেলে। একদিন ঈশান দৌড়ে এসে বলল—
—কাকু, এখানে কি সেতু হবে?
—হবে।
—কী দিয়ে হবে?
—বিশ্বাস দিয়ে।
শিশুটি ভাবল; তারপর বলল—
—তুমি বানাবে?
—তুমি বড় হয়ে বানাবে। আমি এখন কেবল কড়ি-বরগা জোগাড় করছি।
বছরের শেষে পল্লির মেলা। প্যান্ডেলে বাঁশের কঞ্চি, তালপাতার পাখা, বাহারি মিঠাই। সুব্রত মেলাতে যায় না; বাঁশতলায় বসে বাচ্চাদের নিয়ে ‘ন’ থেকে ‘ঊ’ লিখে। দূরে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসে, নদীর ওপর তখন সোনালি চাঁদ। খাতার পাতায় সে লিখে রাখে—“নদী—জীবন”—তলায় ছোট অক্ষরে—“বিপরীত—স্থবিরতা”। কে জানে, হয়তো আগামীকালই কোনো বাচ্চা এসে জিজ্ঞেস করবে—‘স্থবিরতা মানে?’—তখন সে বলবে—‘যখন স্রোত থেমে থাকে; আর আমরা তবু বৈঠা চালাই না।’
একদিন খুব ভোরে ঘাটে দাঁড়িয়ে সুব্রত দেখল, কাশফুলের ভেতর দিয়ে হাওয়া চলেছে। সূর্যের আগে আগে আলো এসে পড়ছে। সে গরুর গলায় হাত বুলিয়ে দিলে গরু চোখ মুদে দাঁড়িয়ে থাকে। কোথা থেকে শালিকের ডাক ভেসে এল। নদীর জল নীলচে।
সে মনে মনে ধীরে বলল—
—থাকিস, বয়ে যাস। আমাদের যত ছোট ছোট জীবন, তাদের পাশে তোর এই বড় বয়ে চলা থাক।
ফিরে যায় বাঁশতলায়। বোর্ডে আজ নতুন শব্দ লিখবে—‘পথ’।
এইখানেই গল্প থামে—শেষ নয়। কপোতাক্ষ বয়ে চলে; এক পাড়ে স্বপ্ন, আরেক পাড়ে দায়িত্ব। মাঝখানে যারা থাকে, তারা কখনও নৌকায়, কখনও সাঁতরে, কখনও কেবল বসে বাতাস দেখে। তবু সাঁকো থাকে—অদৃশ্য, কিন্তু টেকসই; নাম তার—বিশ্বাস।
