সকালের আলো তখনও কুয়াশার চাদরে ঢাকা। ভিজে ঘাসে পা রাখলেই ঠান্ডার শিহরণ গা বেয়ে ওঠে। উঠোনের এক কোণে বসে হরিপদ হুকায় টান দিচ্ছে, ধোঁয়ার ভেতর যেন জমে আছে তার ক্লান্তি আর অসহায়তা।
বছরভর মাঠে খেটে ফসল ফলায়, কিন্তু বাজারে গেলে দাম পড়ে যায় অর্ধেক। সেই আক্ষেপে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“এ সংসার কি আর টানতে পারি রে? খাওয়ার মুখ কমে না, খরচ শুধু বাড়তেই থাকে।”
রান্নাঘরের সামনে বসে গৌরী শাক কুটছিল। পাশে ছোট্ট শ্যামলী কাঠির খেলা নিয়ে মগ্ন। গৌরীর মুখেও চিন্তার রেখা স্পষ্ট
“এই ধানের দামে তো মাসখানেকও চলবে না। রতনের নতুন বই লাগবে, শ্যামলীর জামা-কাপড়ও পুরনো হয়ে গেছে। আর চন্দ্রার পড়াশোনার খরচ তো আলাদা।”
চন্দ্রাবতী দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। হাতে বই ধরা, কিন্তু চোখ যেন বুকের ভেতরকার ভার মাপছিল। কথাগুলো তার কানে হঠাৎ অনেক ভারী হয়ে এল।
ঠিক তখনই রতন খাতা হাতে দৌড়ে এল।
“দিদি, খাতাটা শেষ হয়ে গেছে। স্যার নতুন খাতা আনতে বলেছেন। বাবা, কাল শহরে গেলে নিয়ে আসবে তো?”
হরিপদ চুপচাপ ধোঁয়ায় মুখ ঢেকে রাখল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বলল,
“এই মাসে টাকার টানাটানি বেশি রে। তোকে দু’দিন অপেক্ষা করতে হবে।”
রতনের মুখ গোমড়া হয়ে গেল। শ্যামলী পাশ থেকে সরল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“মা, পুজোয় আমাদের নতুন জামা হবে তো?”
গৌরীর হাত থেমে গেল। উত্তর দেওয়ার মতো শক্তি খুঁজে পেল না।
চন্দ্রাবতীর বুকটা কেঁপে উঠল। নিজের খাতা-কলমের প্রয়োজনের কথাও মনে পড়ল, কিন্তু সে কাউকে কিছু বলতে পারল না। চোখের কোণে জমে থাকা জলকে বইয়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখল।
ক্লাসে বসে মন বসাতে পারছিল না চন্দ্রাবতী। শিক্ষক কবিতা পড়াচ্ছিলেন, বন্ধুরা হাসাহাসি করছিল, অথচ তার দৃষ্টি বারবার জানালার বাইরে চলে যাচ্ছিল। কুয়াশার ফাঁকে ধানক্ষেত, শুকনো মাঠ—সবকিছুই তার সংসারের মতো অনিশ্চিত আর নির্জন লাগছিল।
হঠাৎ প্রধান শিক্ষক ডাকলেন—
“চন্দ্রাবতী, তোমার জন্য একটা খবর আছে।”
সে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল।
“কি স্যার?”
শিক্ষক স্নিগ্ধ মুখে বললেন,
—“প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় তোমার লেখা জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তোমাকে শহরে যেতে হবে। ভালো করলে বিভাগীয় পর্যায়েও ডাক পড়বে।”
চন্দ্রাবতীর বুক দপদপ করে উঠল। মুহূর্তেই মনে হল—স্বপ্নের দরজা একটু যেন খোলা যাচ্ছে। কিন্তু ভেতর থেকে গলা কেঁপে বেরোল,
“স্যার, শহরে যেতে তো অনেক খরচ লাগবে। ভাড়া, থাকা-খাওয়া… সেগুলো কিভাবে হবে?”
প্রধান শিক্ষক তাকে সাহস দিলেন—
“চিন্তা করিস না। স্কুল থেকে যতটা পারি জোগাড় করব, তবে পরিবার থেকেও কিছুটা সাহায্য চাইব।”
চোখে একফোঁটা আলো ঝলমল করে উঠল, কিন্তু সেই আলোর সঙ্গে অভাবের ছায়াও লেগে রইল।
কুয়াশায় ঢাকা মাটির পথ ধরে হাঁটছিল চন্দ্রাবতী। দূরে নদীর কলকল শব্দ ভেসে আসছিল। বুকের ভেতর দ্বন্দ্ব চলছিল—একদিকে নতুন সুযোগ, অন্যদিকে সংসারের দুঃখ।
সে জানে—বাবার হাতে টাকা নেই, মায়ের চোখে প্রতিদিনের দীর্ঘশ্বাস। তবু কি স্বপ্নকে থামিয়ে রাখা যায়?
সন্ধ্যায় উঠোনে প্রদীপ জ্বলে উঠল। গৌরী হাঁড়িতে ভাত বসাচ্ছিল, শ্যামলী খেলায় মগ্ন, রতন বই নিয়ে বসে। হরিপদ তখনো হুকায় ধোঁয়া ছাড়ছিল।
চন্দ্রাবতী সাহস সঞ্চয় করে বাবার কাছে গিয়ে বলল—
—“বাবা, আমার একটা কথা বলার আছে।”
হরিপদ ধোঁয়া ছাড়ল, মুখে ক্লান্তি—
—“কি রে?”
চন্দ্রা কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলল—
—“আমার লেখা প্রবন্ধ জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত হয়েছে। স্যার বলেছে আমাকে শহরে যেতে হবে। স্কুল কিছু খরচ দেবে, বাকিটা আমাদের থেকে দিতে হবে।”
হরিপদ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল—
“তুই বুঝতে পারছিস না রে। সংসার টানতে পারি না, খাওয়াই কষ্ট হয়। তার ওপর আবার মেয়েকে শহরে পাঠানো… মানুষও তো বলবে।”
গৌরী নিরব। তার চোখে দ্বিধার ছায়া—মেয়ের স্বপ্ন আর সংসারের ভারে সে মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছে।
চন্দ্রাবতী মাথা নিচু করল। বুকের ভেতর হাহাকার গর্জে উঠল, তবু মনে মনে বলল—
“আমি শুধু নিজের জন্য চাইছি না। চাই আমার পরিবার, আমার গ্রাম আলোর মুখ দেখুক। বাধা যতই আসুক, আমি থামব না।”
রাত গভীর হলে উঠোনে এসে আকাশের দিকে তাকাল চন্দ্রাবতী। অগণিত তারার ভিড়ে যেন তার স্বপ্নগুলো ঝিলমিল করছে।
ডায়েরি খুলে লিখল—
“আজ বাবা কিছু বলেননি, মা-ও চুপ। সংসারের কষ্ট আছে জানি। তবু যদি একবার সুযোগ পাই, আমি প্রমাণ করব—গরিবের মেয়ে হয়েও স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরা যায়।”
চোখ মুছে ডায়েরি বন্ধ করল সে। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, বাঁশঝাড়ে বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ—সব মিলিয়ে তার বুকের ভেতর আগুনটা আরও জ্বলে উঠল।
সে জানে, পথ সহজ নয়। কিন্তু ভোর আসবেই—এ বিশ্বাস নিয়েই সে লড়াই করে যাবে।
এই গল্পের পরবর্তী পর্বের জন্য যুক্ত থাকুন গল্প গ্রামের সাথে।
