ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি নামেনি। গাছে গাছে শিশির ঝরছে, কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা গ্রাম। এ সময়ে প্রতিদিনের মতো ঘুম ভাঙে চন্দ্রাবতীর। মাটির ঘরের কপাট ঠেলে বাইরে বেরোতেই ঠান্ডা হাওয়া গা জড়িয়ে ধরে। উঠোনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। নামের মতোই শান্ত, তবে চোখে-মুখে আছে দৃঢ়তা আর একরাশ গাম্ভীর্য।
চন্দ্রাবতী হরিপদের বড় মেয়ে। বাবা কৃষিকাজ করেন, মা গৌরী সংসার সামলান। ছোট ভাই রতন ক্লাস ফোরে পড়ে, আর বোন শ্যামলী মাত্র আট বছরের। সংসারের বড় মেয়ের দায়িত্ব প্রায় সবই চন্দ্রাবতীর কাঁধে। ভোরে উঠেই প্রথমে কলসিতে পুকুরের জল তোলে, হাঁড়ি-পাতিল মাজে, তারপর মাকে সাহায্য করে রান্নাঘরে।
“চন্দ্রা, হাঁড়িটার ঢাকনা দাও তো, আমি তরকারি বসাচ্ছি”—মা ডাকেন।
সে দ্রুত হাতের কাজ ফেলে মাকে সাহায্য করে। সংসারের প্রতিটি কাজে তার উপস্থিতি যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
খাওয়া-দাওয়া সেরে বাবা মাঠে যান। রোদ ওঠার আগেই চাষাবাদে নামতে হয়। চন্দ্রাবতী তখন স্কুলের জন্য তৈরি হয়। তার গ্রামের একমাত্র উচ্চবিদ্যালয়, আধঘণ্টার পথ। পথটা মাটির, বর্ষাকালে কাদা, শীতের ধুলো। তবু প্রতিদিন খাতা-বই হাতে সে হেঁটে যায়।
স্কুলের প্রতি তার এক অদ্ভুত টান। ক্লাস টেনে পড়ে সে, আর তার স্বপ্ন একদিন শিক্ষক হবে। মায়ের কথায় মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়।
“মেয়ে, এত পড়াশোনা করে কী হবে? তোকে তো একদিন সংসারেই ঢুকতে হবে।”
চন্দ্রাবতী কিছু বলে না। জানে মা বাস্তব কথা বলছেন। তবু ভেতরে ভেতরে বিশ্বাস করে—মানুষের স্বপ্ন যদি থেমে যায়, তবে বেঁচে থাকার মানে কোথায়?
স্কুলে পৌঁছালে বন্ধুদের হাসি-গল্পে মেতে ওঠে। ক্লাসে শিক্ষক যখন জীবনানন্দ দাসের কবিতা পড়ান, চন্দ্রাবতীর বুকের ভেতর কেমন হাহাকার বাজে। “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে”—এই লাইন শুনে মনে হয়, ধানক্ষেত, নদী, মাঠই তো তার আত্মার সঙ্গে মিশে আছে। একদিন যদি ছেড়ে যেতে হয়, সে কি পারবে?
দুপুরে ছুটি হলে মেয়েরা দল বেঁধে বাড়ি ফেরে। কারও হাতে শাকপাতা, কারও হাতে বই। চন্দ্রাবতী হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, বিকেলে আবার কাজ আছে—পুকুর থেকে জল তোলা, গরুতে ঘাস কাটা, শ্যামলীকে পড়ানো। সংসারের টানাপোড়েন কখনো তাকে ক্লান্ত করে তোলে, আবার কখনো মনে হয়—এই দায়িত্বই তাকে গড়ে তুলছে।
সন্ধেবেলা উঠোনে দীপ জ্বলে। ধূপের গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। চন্দ্রাবতী তখন ভাইবোনের সঙ্গে বসে খাতা মেলে ধরে। শ্যামলী হাবভাব করে পড়তে চায় না। রতন খেলতে বেরোতে চায়। ধৈর্য ধরে তাদের পড়ায় সে। মা দূর থেকে দেখে মৃদু হেসে বলেন, “তুই না থাকলে আমি কীভাবে সামলাতাম, বল তো?”
তবে সংসারে সবসময় মধুরতা থাকে না। মাঝে মাঝে অভাবের ছায়া নেমে আসে। এক সন্ধ্যায় বাবা ক্লান্ত মুখে বললেন, “ধানের দাম আবার কমে গেল। এই আয়ে সংসার চালানো দায়।”
চুপচাপ শুনছিল চন্দ্রাবতী। তার বুকের ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে। পড়াশোনার খরচ, ভাইয়ের ভবিষ্যৎ, বোনের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে সংসার যেন এক অদৃশ্য শেকল।
সেই রাতে খাতা-কলম হাতে বসে সে ডায়েরিতে লিখল—
“আমি শুধু চাষির মেয়ে নই। আমি শুধু সংসারের বড় বোনও নই। আমি একজন মানুষ, যার স্বপ্ন আছে। আমি শিক্ষক হতে চাই। আমি চাই গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়ে মানুষ হোক। হয়তো অভাব আছে, কিন্তু স্বপ্নের দাম তো টাকায় মাপা যায় না।”
ডায়েরি বন্ধ করে উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশভরা তারা দেখে মনে হল, তার স্বপ্নও ওই তারাদের মতো অসংখ্য, ঝলমলে। হয়তো সব পূর্ণ হবে না, তবু কিছু স্বপ্ন আলো ছড়াবেই।
এভাবেই দিন কেটে যায়। ভোর থেকে রাত — সংসারের কাজ, পড়াশোনা, স্বপ্ন আর দায়িত্বের টানাপোড়েন।
একদিন স্কুলে শিক্ষক বললেন, “আগামী সপ্তাহে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হবে। যার লেখা ভালো হবে, সে জেলা পর্যায়ে যাবে।”
চন্দ্রাবতীর বুক দপদপ করতে লাগল। সেই রাতে পড়ার টেবিলে বসে আলো-আঁধারিতে লিখল—“গ্রামীণ জীবনের স্বপ্ন”। নিজের জীবনের ছবি আঁকল খাতার পাতায়। লিখল কেমন করে গ্রামের মেয়েরা স্বপ্ন দেখলেও সংসারের দায়ে থেমে যায়, আবার কেমন করে সেই স্বপ্নই তাদের বাঁচিয়ে রাখে।
প্রতিযোগিতার দিন শিক্ষক তার লেখা পড়ে শোনালেন। গোটা ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শেষে করতালি উঠল। শিক্ষক চোখ মুছে বললেন, “চন্দ্রাবতী, তুমি শুধু ভালো ছাত্রী নও, তুমি বড় মনের মানুষও।”
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মা’কে জড়িয়ে ধরল সে। বলল, “মা, আমি একদিন শিক্ষক হব।”
মা অবাক হয়ে তাকালেন, তারপর ধীরে ধীরে হাসলেন। হয়তো বুঝলেন, মেয়ের ভেতরে যে জেদ আছে, তা সহজে ভাঙা যাবে না।
রাত গভীর হলে উঠোনে বসে থাকে চন্দ্রাবতী। দূরে বাঁশঝাড়ে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে গোটা গ্রাম। বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি নামে। সে জানে, পথ সহজ নয়। তবু যে মেয়ে ভোরে মাঠের কুয়াশা ভেদ করে স্কুলে যায়, যে মেয়ে সংসারের টানাপোড়েনের মাঝেও খাতা-কলম আঁকড়ে ধরে, তার স্বপ্ন একদিন পথ খুঁজে নেবেই।
চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলে ওঠে—
“আমি চন্দ্রাবতী। আমি গ্রামীণ মেয়ে। আমার জীবন কষ্টে ভরা, তবু আমি স্বপ্ন দেখি। আমি চাই আমার আলো দিয়ে চারপাশ আলোকিত করতে।”
চাঁদ তখন আকাশে পূর্ণিমার মতো ঝলমল করছে। আর চন্দ্রাবতী জানে, তার ভেতরেও ঠিক তেমনই এক পূর্ণিমার আলো জমে উঠছে—যা একদিন শুধু তার নয়, পুরো গ্রামের অন্ধকার কাটিয়ে দেবে।
