গ্রামের ছোট্ট হাইস্কুলটা যেন দুপুরবেলা ঘুমিয়ে থাকে। মাঠের চারপাশে শিমুল গাছ, বারান্দায় ছেলেমেয়েদের ভাঙা ভাঙা হাসি, আর ভেতরে চকচকে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে টিচারদের একঘেয়ে পাঠ। এই স্কুলেই পড়ে রিহান আর ঐশী। দু’জনেরই ক্লাস টেন।
রিহান মাঝারি ঘরের ছেলে। বাবা দিনমজুর, মা গৃহিণী। পড়াশোনায় খারাপ নয়, তবে খুব মেধাবীও নয়। চুপচাপ স্বভাবের জন্য ওকে সবাই বেশি পাত্তা দেয় না। অথচ ওর ভেতরে লুকানো থাকে অসংখ্য স্বপ্ন।
ঐশী হলো গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটি। ফর্সা গায়ের রঙ, লম্বা চুল, আর চোখে অদ্ভুত এক শান্তি। বাড়ি তুলনায় সচ্ছলবাবা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, সংসারে অভাব নেই। সে কারণে ঐশীকে স্কুলের অনেকেই “অন্যরকম” মনে করে।
রিহান আর ঐশীর পরিচয় খুব সাধারণভাবেই হয়েছিল। একই ক্লাসে বসত। শুরুতে তেমন কথা হতো না। কিন্তু একদিন গণিতের স্যার হঠাৎ বলে দিলেন ঐশী, তুমি রিহানকে বুঝিয়ে দাও এই অংকটা, ও পারছে না।
সেদিন থেকেই শুরু হলো তাদের প্রথম কথোপকথন। ঐশী বোর্ডে দাগ টেনে টেনে বুঝিয়ে দিয়েছিল, আর রিহান নির্বাক তাকিয়ে ছিল তার দিকে। সেই দিনের পর থেকে প্রতিটি সংখ্যার ফাঁকে, প্রতিটি পাঠের মাঝে রিহানের মনে শুধু ঐশীর হাসি ভেসে উঠতে লাগল।
স্কুলে আসা-যাওয়া, খেলাধুলা, লাইব্রেরি সবখানেই অদ্ভুতভাবে দু’জনের দেখা হতে থাকল। ঐশী ক্লাসে টিফিন আনত, মাঝে মাঝে অর্ধেকটা রিহানকে দিয়ে দিত। রিহান প্রথমে নিতে চাইত না, কিন্তু ঐশীর চোখের অনুরোধে অবশেষে হাত বাড়িয়ে দিত।
একদিন টিফিনের সময় ঐশী খোলা খাতার এক কোণে ছোট্ট করে লিখল
“তুমি এত চুপচাপ কেন?”
রিহান কলম হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ভেবেও লিখতে পারল না কিছু। শুধু একটা দাগ টেনে রেখে দিল। সেই দাগই তাদের প্রথম গোপন ভাষা হয়ে রইল।
দিন কেটে যেতে লাগল। তাদের মধ্যে কোনো প্রকাশ্য প্রণয়ের কথা হয়নি। তবু গ্রামের রাস্তায় যখন দু’জন হেঁটে যেত, বাতাস যেন অন্য রকম হয়ে উঠত। রিহান সাইকেল চালিয়ে যেত স্কুলে, আর ঐশী প্রায়ই তার পাশ দিয়ে হাঁটত। রিহান কিছু বলতে পারত না, শুধু সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে সামান্য এগিয়ে যেত। ঐশীও লাজুক হাসি দিত।
মে মাসের গরম দুপুর। পরীক্ষা শেষ হয়েছে, সবাই বাড়ি চলে গেছে। স্কুলের পেছনের আমগাছটার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিল রিহান। হঠাৎ ঐশী এসে হাজির। বলল,
“তুমি কি কখনও কাউকে কিছু বলতে চেয়েছো, কিন্তু সাহস পাওনি?”
রিহান প্রথমে চুপ করল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“হ্যাঁ… প্রতিদিনই।”
ঐশী তাকাল তার দিকে। ওদের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তে সব বলে দিল। শব্দের দরকার রইল না। সেই বিকেলটা তাদের সম্পর্কের বাঁধনকে আরও গভীর করল।
কিন্তু সব গল্প তো মসৃণ হয় না। গ্রামে কানাকানি শুরু হয়ে গেল। কারও চোখ এড়িয়ে যায়নি যে রিহান আর ঐশী একে অপরকে একটু আলাদাভাবে দেখে।
ঐশীর মা একদিন কড়া স্বরে বললেন,
“তুই রিহানের সঙ্গে এত কথা বলিস কেন? ও আমাদের সমান ঘরের ছেলে না।”
ঐশী মুখ নামিয়ে চুপ করে রইল। রিহানও খবর পেল, তার মা সতর্ক করেছেন
“তুই ঐশীর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করিস না। ওদের ঘর আলাদা, আমাদের মানাবে না।”
কিন্তু মন তো আর পরিবারের বাঁধা মানে না। রিহান আর ঐশী দেখা করত গোপনে। কখনও লাইব্রেরির অন্ধকার কোণে, কখনও খেলার মাঠে। দু’জনের হাত স্পর্শ হতো মুহূর্তের জন্য, অথচ সেই ছোঁয়া যেন জীবনভর থেকে যাওয়ার মতো।
মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলো। ফলও খারাপ এল না। রিহান স্বপ্ন দেখছিল, কলেজে উঠে হয়তো আরও কাছাকাছি আসবে ঐশী। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলল।
ঐশীর পরিবার তাড়াহুড়া করে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলল শহরের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। বয়সে অনেক বড়, কিন্তু অর্থে সমৃদ্ধ। ঐশীর কোনো মতামতের জায়গাই রইল না।
সেদিন বিকেলে স্কুলের শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল রিহান আর ঐশীর। তারা দু’জনেই জানত এটাই শেষ।
ঐশী ফিসফিস করে বলল
—“আমরা কি ভুল করেছিলাম?”
রিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
“না, আমরা ভালোবেসেছিলাম। ভুল করেছে পৃথিবী।”
তাদের চোখ ভিজে উঠল। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই—তবু সেই মুহূর্তে তারা ছিল ভীষণ সুখী। কারণ তারা জানত, সত্যিকারের প্রেম কোনোদিন মরে না, শুধু রূপ পাল্টায়।
কয়েক মাস পর গ্রামের মানুষ শুনল ঐশীর বিয়ের খবর। ঝলমলে আলোয় ভরা অনুষ্ঠানে সবাই খুশি, কিন্তু রিহানের চোখে তখন অদৃশ্য এক শূন্যতা।
সে রাতে বাড়ি ফিরে রিহান নিজের ডায়েরিতে লিখল
যা আমাদের হয়নি, তবু আমি জানি ও-ই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। হয়তো পূর্ণতা পাইনি, কিন্তু ভালোবাসা পেয়ে গেছি।
স্কুল জীবনের সেই প্রেম পূর্ণ হয়নি, কিন্তু তাদের অনুভূতি থেকে গেছে চিরকাল। ঐশী হয়তো অন্য জীবনে পা রেখেছে, আর রিহান লড়াই করছে নিজের স্বপ্নের সঙ্গে—তবু দু’জনের মনে সেই শেষ বেঞ্চের স্মৃতি, সেই টিফিন ভাগাভাগি আর গোপন খাতার দাগ চিরদিন অমলিন হয়ে রইল।
কারণ কিছু প্রেম পূর্ণ হয় না, অথচ অসম্পূর্ণ হয়েও সবচেয়ে সুন্দর থেকে যায়।
