তিন মোড়ের নীরবতা
ভোরের গ্রাম যেন তখনও আধো ঘুমে। পূর্ব আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে আছে, নদীর ধার থেকে ভেসে আসছে ভেজা কাদার গন্ধ আর কাকের ডাক। দূরের তালগাছের ফাঁক দিয়ে কুয়াশার সরু রেখা যেন নদীর বুক ছুঁয়ে যাচ্ছে।
তিন রাস্তার মোড়টা খুব বড় কিছু নয়—একপাশ দিয়ে ধানক্ষেতের সরু বাঁশের সেতু, অন্যদিকে বাজারের কাঁচা রাস্তা, আর সোজা গেলে স্কুলের পথ। এখানে একটা পুরনো হিজল গাছ আছে, গাছের নিচে ভাঙা ইটের বসার জায়গা, যেখানে মাঝে মাঝে গ্রামের ছেলেরা গল্প করে।
হৃদয় খুব একটা ভোরের দিকে এখানে আসে না, কিন্তু সেদিন অদ্ভুত এক টানেই যেন চলে এসেছিল। হাতে খাতা, কাঁধে পুরনো ব্যাগ, মনটা কেমন যেন খালি খালি।
ঠিক তখনই সে দেখল—দূরের ধুলো ভরা রাস্তা ধরে একজন মেয়ে হাঁটছে। সাদা ওড়না মাথায়, নীল স্কুল ড্রেসের নিচে হালকা গোলাপি ফিতে বাঁধা চুল, হাতে বই। হাঁটার ভঙ্গিতে একরকম অচেনা সৌন্দর্য—যেন নদীর ধারে হঠাৎ দেখা পাওয়া শাপলা ফুল।
হৃদয়ের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
মেয়েটি মোড়ে এসে সামান্য থামল, তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে যেন মুহূর্তের জন্য কিছু ভাবল। বাতাসে তার চুলের বাঁধন উড়ে গিয়েছিল, হৃদয়ের মনে হলো, এই দৃশ্য হয়তো সারাজীবন মনে থাকবে।
সেদিন থেকেই শুরু হলো তার নীরব গল্প—যেখানে নদীর ঢেউ, সকালবেলার রোদ আর তিন রাস্তার মোড় হয়ে উঠল এক অদৃশ্য অপেক্ষার জায়গা।
সেই প্রথম দিনের পর থেকে হৃদয়ের জীবন যেন বদলে গেল।
প্রতিদিন সকাল হলেই তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করত—ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে থাকে, শুধু ওই নির্দিষ্ট সময়টার জন্য অপেক্ষা।
তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সে জানত, ঠিক কয়েক মিনিটের মধ্যেই মেয়েটি আসবে।
নদীর দিক থেকে হালকা কুয়াশা ভেসে আসত, আর সে বুকের ভেতরের ধুকপুকানি সামলানোর চেষ্টা করত। দূরে নীল ড্রেসের আভা দেখা দিলেই তার শরীরের প্রতিটা রক্তধারা যেন দ্রুত বইতে শুরু করত।
মেয়েটি প্রতিদিন হেঁটে যেত, মাঝে মাঝে চোখ তুলে চারপাশ দেখত, কিন্তু হৃদয় কখনও চোখে চোখ রাখতে পারত না। লজ্জা আর ভয় একসাথে যেন তার পায়ের গোড়ায় শিকল বেঁধে রাখত।
“আজ বলব” প্রতিদিনই সে মনে মনেই ঠিক করত।
কিন্তু কাছে যেতেই বুকের ভেতর কেমন শুকনো বাতাস বয়ে যেত, গলা শুকিয়ে যেত, শব্দ আটকে যেত ঠোঁটের আড়ালে।
একদিন সে সাহস করে কয়েক পা এগিয়ে গেলো।
মেয়েটি তখন রাস্তার ধারে নদীর দিকে একবার তাকিয়ে হাঁটছিল। হৃদয়ের ঠোঁট কেঁপে উঠল
“শোনো… আমি…”
কিন্তু ঠিক তখনই রাস্তার অন্য দিক থেকে কয়েকজন ছেলে এসে হাসাহাসি করতে করতে চলে গেল।
হৃদয়ের মুখে কথা শুকিয়ে গেল,সঞ্চয় করা সব টুকু মনের জোর যেনো হারিয়ে গেলো মুহূর্তে। সে চুপ করে আবার পেছনে সরে এল।
দিন যায়, মাস যায়—এই নীরব অপেক্ষা আর না-পারা বলার কষ্টের মধ্যে।
নদী প্রতিদিনই বয়ে যায়, রোদ প্রতিদিনই উঠে, কিন্তু হৃদয়ের ভিতরে জমতে থাকে এক অদ্ভুত অপূর্ণতা।
সেদিনও সকালটা অন্য দিনের মতোই ছিল—নদীর ধারে হালকা কুয়াশা, বাতাসে ধানের গন্ধ, আর হৃদয়ের ভেতরে সেই চিরচেনা অস্থিরতা।
তিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবছিল—
“আজ না বললেই নয়… আজ বলে দেব!”
কিন্তু সেই অপেক্ষা আর পূর্ণ হলো না।
ঘড়ির কাঁটা অনেকটা এগিয়ে গেল, তবু নীল ড্রেসের মেয়েটি এল না।
মাথায় হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল—
কিছু হয়েছে নাকি? অসুস্থ? নাকি…
বিকেলের দিকে খবর এল—মেয়েটি শহরে চলে গেছে, ভালো কলেজে ভর্তি হতে।এবং সেখানে কোথাও থেকে লেখাপড়া করতে।
সকালের রাস্তা, নদীর ধারে হাঁটার শব্দ, চোখের আড়াল থেকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকা—সবই যেন এক মুহূর্তে শূন্য হয়ে গেল।
পরের দিন সে তবুও মোড়ে গিয়েছিল, যেন ভুলবশত মেয়েটি আবার এসে পড়বে।
কিন্তু রাস্তা ফাঁকা, নদীর জল বয়ে যায় নিজের মতো।
এভাবে ক’দিন গেছে, তারপর সে আর যায়নি।
মনটা বলত—“যদি বলে ফেলতে, তবে অন্তত জানত সে তোমার কথা…”
কিন্তু সাহসহীন সেই কিশোর হৃদয় শুধু নদীর ঢেউয়ের মতো গোপনে গোপনে ভেঙে যেতে শিখল।
আর তিন রাস্তার মোড় হয়ে রইল তার জন্য এক নীরব স্মৃতিস্তম্ভ—যেখানে ভালোবাসা ছিল, কিন্তু উচ্চারণ ছিল না।
