শীতের সকালের কুয়াশা তখনও নামেনি। নদীর ধারে কাশফুলগুলো শিশিরে ভিজে চকচক করছে। বাঁশবনের আড়াল থেকে ভেসে আসছে দোয়েলের ডাক। এমন নিস্তব্ধ সকালেই সোহান প্রাতঃভ্রমণে বেরোয় প্রতিদিন। তার চোখে থাকে দূরের অজানা স্বপ্নের আলো।
গ্রামের লোকেরা তাকে দেখে আড়চোখে হাসাহাসি করে। ডান হাতটা জন্ম থেকেই অচল তার। তাই কেউ তাকে কাজের ছেলে ভাবে না। অন্য ছেলেরা মাঠে বল খেলে, দড়ি লাফায়, গাছে উঠে আম পেড়ে আনে—সে কেবল দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। মাঝে মাঝে বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে ওঠে।
তবুও সোহান নিরুৎসাহ হয় না। তার মা প্রায়ই বলেন—
“মানুষের আসল শক্তি হাত-পায়ে নয় রে খোকা,মানুষের আসল শক্তি তার মনটাতে। মন যদি না হারে , তবে দেহের কোনো দুর্বলতাই তাকে হারাতে পারে না।”
একদিন গ্রামের মেলায় বসেছিল কুস্তির আসর। ঢাকঢোল বাজছে, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে দর্শকরা। বিশাল দেহের রশিদ লড়ছে আর সবাই হাততালি দিচ্ছে। দূর থেকে দাঁড়িয়ে সোহানের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। মনে হলো—সে-ই যদি এই মঞ্চে দাঁড়াতে পারে! মনের ইচ্ছা প্রকাশ করল দাড়িয়ে থাকা বন্ধুদের মধ্য সে।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আশেপাশের ছেলেরা হেসে উঠল।
“ও? ওই হাত নিয়ে কুস্তি? অসম্ভব!”
কথাগুলো কানে বিঁধল, তবু বুকের ভেতর শপথ করে ফেলল সোহান—
“আমি নামব। যাই হোক না হোক, চেষ্টা করব।”
রাতের নীরবতা নামলে উঠোনে একা একাই অনুশীলন শুরু করল সে। চাঁদের আলোয় ঘামে ভিজে যায় গা। লাঠি হাতে ঘুরে ঘুরে ভারসাম্য রাখার কৌশল শিখে নেয়। পড়ে গেলে আবার উঠে দাঁড়ায়। দুর্বল হাতকে বাদ দিয়ে শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরাকে অভ্যস্ত করে তোলে লড়াইয়ের জন্য।
গ্রামের এক বৃদ্ধ কৃষক, যিনি প্রতিদিন ভোরে মাঠে যান, সোহানকে দেখে বললেন—
“বাবা, শক্তি পেশীতে যতটুকু আছে, বুদ্ধিতে তার চেয়ে বেশি। কৌশল শিখে নে, তাহলেই জিতবি।”
সেই কথাটাই যেন নতুন আলো হয়ে জ্বলে উঠল তার মনে।
অবশেষে প্রতিযোগিতার দিন এল। মাঠ ভরা মানুষ। আকাশে ঝুলে আছে রোদের সোনালি আলো। সোহান যখন মাটিতে নেমে দাঁড়াল, তখনো হাসাহাসি থামল না।
“আজ খেলা দেখতে মজা হবে,” কেউ কেউ বলল।
বাঁশি বাজতেই রশিদ ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিশাল শরীরের আঘাতে সোহান ছিটকে পড়ে গেল ধুলোয়।দর্শকের ভিড় একসাথে হেসে উঠল।
কিন্তু সোহান উঠে দাঁড়াল। চোখেমুখে অদ্ভুত দীপ্তি।
বারবার পড়তে হলো তাকে। তবু প্রতিবার আগের চেয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। রশিদ যত শক্তি খরচ করছে, ততই ক্লান্ত হচ্ছে। আর সোহান কৌশলে তার গতি নিজের সুবিধায় ব্যবহার করল। শেষে আচমকা এক ফাঁক পেয়ে রশিদকে মাটিতে ফেলে দিল।
মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল ভিড়। তারপর করতালির ঝড় উঠল।
“সোহান! সোহান!”
গ্রামের মুরুব্বি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—
“আজকের দিনে আমরা শিখলাম, শরীরের শক্তি নয়—অদম্য মনই মানুষকে বড় করে তোলে।”
মায়ের চোখ ভিজে উঠল। তিনি দূর থেকে হাত তুলে দোয়া করলেন।
সেদিন থেকে সোহান কেবল এক কুস্তিগীর নয়, গ্রামের ছেলেমেয়েদের আশা হয়ে উঠল। যে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে, যে নিজেকে অক্ষম ভাবে, সবার কাছে সোহান বলত—
“তুমি যতবার পড়বে, ততবার উঠে দাঁড়াবে। হার মানা মানেই শেষ নয়।”
উপসংহার
পাখির ডাক যেমন ভোরের অন্ধকার সরায়, তেমনি মানুষের জেদ আর বিশ্বাস জীবনের সব উপহাস, দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতাকে সরিয়ে দেয়।
সোহানের গল্প তাই শুধু এক কুস্তিগীরের নয়—এটা অদম্য মনোবলের কাহিনি, যা প্রতিটি গ্রামের ছেলেমেয়ের বুকের ভেতর নতুন আলো জ্বালিয়ে দেয়।
