🌼 “কদম ফুল ঝরে গেলে”
(প্রেম, অপেক্ষা আর শেষ না হওয়া প্রশ্ন)
সিরাজপুর গ্রামের স্কুলটা খুব ছোট।
সামনের মাঠে দুপুরে ছাগল চরানো হয়, আর পেছনে একটা বিশাল কদম গাছ—যেটা বর্ষা আসলে সাদা ফুলে ভরে যায়।
ছেলেমেয়েরা বলে, যে গাছে কদম ফোটে, তার নিচে দাঁড়িয়ে যদি মন থেকে কারও নাম বলা যায়, সেই মানুষটা স্বপ্নে ঠিক এসে যায়।
সেই কদম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একদিন তৃষা প্রথম দেখেছিল আরিবকে।
আরিব ছিল খুব সাধারণ ছেলে—সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসে, বেশি কথা বলে না, ক্লাসে মাঝামাঝি রোল নম্বর।
কিন্তু তার এক জোড়া চোখ—যা মনে হত সবকিছু বুঝে ফেলে, অথচ কিছুতেই কিছু বলে না।
তৃষা প্রথমে কথাও বলত না, কিন্তু একদিন কদম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আরিব হঠাৎ জিজ্ঞেস করল—
“তুই বৃষ্টি পছন্দ করিস?”
তৃষা মাথা নেড়ে বলেছিল,
“পছন্দ করি না, কিন্তু তোর পাশে দাঁড়ালে খারাপও লাগে না…”
এরপর কদম গাছ হয়ে উঠল তাদের দেখা করার জায়গা।
কারণ পর পর ৪ টা ক্লাস পরে টিফিন পিরিয়ড ।
কথা হতো না খুব একটা, কিন্তু চোখে চোখ পড়লেই তৃষার বুকের ভিতর কেমন কেপে কেপে উঠে।
একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল খুব, আরিব তৃষাকে একটা কদম ফুল দেয়।
তৃষা জিজ্ঞেস করেছিল,
“ফুল দিলি কেন?”
আরিব বলেছিল,
“যেদিন তুই কাঁদবি, এই গন্ধটা বুকের পাশে রাখিস।”
তৃষা হেসে বলেছিল,
“আমি তো কাঁদি না।”
কিন্তু গল্প তো সবসময় তার মতো চলে না।
একদিন স্কুলে আসে খবর—আরিব আর আসবে না।
তার বাবাকে হঠাৎ শহরে পাঠানো হয়েছে কাজে।
হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করবে। বিদায় জানানোর মতো কোনও দিনও দেয়নি।
তৃষা তখন ক্লাস টেন।
সে কদম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল, একবারও চোখে জল আসেনি—শুধু সেই কদম ফুলটা বুকের কাছে ধরে রেখেছিল।
এসএসসি শেষ করে তৃষা ভর্তি হয় পাশের শহরের কলেজে।
আরিবের কথা তখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে, কিন্তু কেউ কিছু জানে না।
সে কোথায় আছে, আদৌ ফিরবে কিনা—সব যেন একরকম ঝাপসা।
তৃষা একদিন কলেজ থেকে ফিরছিল—জুন মাসের মাঝামাঝি, হঠাৎ হালকা বৃষ্টি নামল।
বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে যেতে যেতে সে হঠাৎ একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ায়।
ভেজা শরীরে ঠান্ডা হাত কাপা কাপা করছে। দোকানে বসে আছে এক তরুণ—একদম চুপচাপ, ছাতা গুটিয়ে পাশে রেখেছে, তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে।
তৃষা প্রথমে চিনতে পারেনি।
কিন্তু সেই চোখ… সেই দৃষ্টিটা…!
একসময় সেই তরুণ মুখ ঘুরিয়ে তাকায়।
তৃষা থমকে দাঁড়ায়।
আরিব।
একটু শুকিয়ে গেছে, চেহারায় ক্লান্তি, চোখের নিচে হালকা কালি—কিন্তু ঠিক সেই আরিব, কদম ফুলের গন্ধ মাখা সেই সময়ের মানুষ।
তৃষা ধীরে গিয়ে বসে। কিছু বলে না।
আরিব আগে বলে—
“তুই চুপ করে আছিস, কিন্তু আমি জানি তুই চিনেছিস…”
তৃষা বলে না কিছু, শুধু জিজ্ঞেস করে,
“তুই কই ছিলি?”
আরিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—
“আমার বাবা আমাকে শহরে পাঠায়, খুব কঠিন সময় গেছে… ফোনও রাখতে দেয়নি। অনেকবার তোর খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়?”
তৃষা তাকিয়ে থাকে চায়ের কাপের ধোঁয়ার দিকে।
আরিব বলে—
“তুই কাঁদিস?”
তৃষা মাথা নেড়ে বলে—
“না। আমি আর কাঁদি না। কিন্তু বৃষ্টি হলে এখনও মনে পড়ে, কদম ফুল ফুটেছে কিনা…”
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর আরিব পকেট থাকা মানিব্যাগ থেকে পুরনো একটি কাগজে মোড়া কদম ফুলের শুকনো দলা বের করে দেয় তৃষার দিকে।
বলে—
“এইটা তখন তোর জন্য রেখে ছিলাম… তুই যদি একদিন বৃষ্টি ভেজা পথে আমায় দেখিস, আমি যেন চিনতে পারি।”
তৃষা কিছু বলে না।
শুধু হাত বাড়িয়ে নেয়।
চায়ের কাপে ধোঁয়া, কদম ফুলের গন্ধ, আর চোখের ভেতর পুরনো সেই অব্যক্ত ভালোবাসা যেন আবার জেগে ওঠে।
কেউ কাউকে প্রেম প্রস্তাব দেয় না।
কেউ “ফিরে এসো” বলে না।
তবুও সেদিন, শহরের এক বৃষ্টিভেজা চায়ের দোকানে,
দু’টি মন আবার পাশাপাশি বসে ছিল—
যেখানে ভালোবাসা শব্দের চেয়ে বেশি কিছু।
❝ ভালোবাসা সবসময় বলে না, “আমি ফিরে এসেছি।”
কখনও কখনও, সে চুপ করে পাশে বসে চা খায়…
আর একটা কদম ফুল এগিয়ে দেয়। ❞
