ফেসবুকের অচেনা ভিড়ের ভেতর একদিন মিমের নাম ভেসে উঠেছিল সায়নের টাইমলাইনে। প্রোফাইলের ছবিটা ছিলো সাধারণ—সাদা শাড়ি, চোখে কালো চশমা, মুখে হালকা হাসি। কিন্তু সায়নের কাছে সেটা কোনো সাধারণ ছবি ছিল না। যেন ছবির ভেতর থেকে কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখে এক অদ্ভুত আকর্ষণ। সেই আকর্ষণই তাকে “Add Friend” বাটনে ক্লিক করাতে বাধ্য করল।
প্রথম কথাটা খুবই ছোট্ট—
“আসসালামু আলাইকুম কেমন আছেন?”
মিম উত্তর দিল বহুদিন বাদে , একেবারে ভদ্র ভঙ্গিতে—
“ভালো, আপনি?”
তারপর দিনগুলো কেটে গেল। প্রথমে কথাগুলো ছিল আনুষ্ঠানিক, খোঁজখবর, পড়াশোনার ব্যস্ততা নিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে আলাপ জমে উঠল—রাতের পর রাত, গল্পের পর গল্প। কখনো পড়াশোনার চাপ, কখনো জীবন নিয়ে হতাশা, আবার কখনো নিরীহ মজার কথা। সায়ন বুঝলো, মিম শুধু তার বন্ধুর ফুপাতো বোন নয়—সে যেন এক অচেনা পৃথিবী, যাকে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করছে।
মিম তখন মাস্টার্স করছে, সায়ন অনার্স শেষ বর্ষে। বয়সের তফাৎ খুব একটা নয়, কিন্তু সম্পর্কের ভেতরে এক অদৃশ্য দেয়াল ছিল—মিমের চোখে সায়ন তার ছোট ভাইয়ের বন্ধু।
সায়ন সেই দেয়াল মানতে চাইল না। ধীরে ধীরে সাহস সঞ্চয় করে একদিন লিখলো—
“মিম, একটা কথা বলব… আমি আপনাকে বন্ধুর বড় বোন হিসেবে দেখি না।”
মিম ভেবেছিল এটা নিছক মজা। হেসে জবাব দিল—
“তুমি সিরিয়াস নাকি? এগুলো ছোট ছেলেরা বলে বেড়ায়।”
কিন্তু সায়ন থামলো না। দিন দিন, রাত রাত, একই কথা বলেছে—
“আমি সত্যিই আপনাকে ভালোবাসি।”
প্রথমে বিরক্ত, পরে অবাক, তারপর ধীরে ধীরে নরম হয়ে গেল মিম। মানুষের প্রতি টানা যত্ন, প্রতিদিন খোঁজ নেওয়া, প্রতিটি পরীক্ষার আগে সাহস জোগানো—এসব তো মজা হতে পারে না। একদিন চুপ করে সে মেসেজ করল—
“তুমি যদি সত্যিই সিরিয়াস হও, তবে ভেবে দেখো… আমি কার বোন?”
এই লাইনটা সায়নের বুক ফালা ফালা করে দিয়ে গেল। সে জানতো, সমাজে এটা সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব না। বন্ধুদের হাসি-তামাশা, পরিবারের চাপ, মানুষের চোখের বাঁকা দৃষ্টি—সব মিলেই এক অদৃশ্য শিকল। কিন্তু ভালোবাসা তো যুক্তির হিসাব মানে না।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে তাদের কথোপকথন চলল। দেখা কিন্তু একবারও হলো না, বেশিরভাগই ফোন আর চ্যাটে। তবুও সেই অদৃশ্য টান তাদের জীবনের সবচেয়ে সত্যি অনুভূতি হয়ে উঠলো।
কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবতার চাপ বাড়লো। মিমের পরিবার তার বিয়ের কথা তুললো। মিম প্রথমে প্রতিবাদ করলেও শেষমেশ ভেঙে পড়লো। এক রাতে সায়নকে লিখলো—
“তুমি জানো, আমি তোমাকে চাই… কিন্তু আমি আমার পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে পারব না। সমাজে এটা কেউ মেনে নেবে না।”
সায়নের চোখ ভিজে উঠলো। ফোন হাতে নিয়ে শুধু লিখলো—
“তাহলে আমি কোথায় দাঁড়াবো?”
মিম উত্তর দিল না। শুধু তিনটে ডট ভেসে উঠলো স্ক্রিনে, তারপর সেগুলোও মিলিয়ে গেল।
বিয়ের দিন সায়ন ভিড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ জানতো না সে এসেছে। মিম লাল শাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে কাজল গাঢ়, ঠোঁটে হালকা হাসি। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকোনো ব্যথা সায়নই শুধু বুঝলো। এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখাচোখি হলো। ভিড়, আলো, গানের শব্দ সব থেমে গেল যেন। চোখের ভাষায় শুধু একটাই কথা
“আমরা পারলাম না।”
সেদিনের পর মিম আর সায়নের কথা হয়নি। শুধু প্রতিদিন রাতে সায়ন নিজের ডায়েরিতে কিছু লিখতো। সে লিখতো না কবিতা, লিখতো না গল্প—শুধু মিমের জন্য অপ্রকাশিত চিঠি। প্রতিটি চিঠি শেষ হতো একই কথায়—
“তুমি আমার ছিলে না, তবুও তুমি আমার থাকবে—আমার নিঃশব্দ ভালোবাসায়।”
